Friday, June 24th, 2016
হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ ডেজার্ট
June 24th, 2016 at 10:42 pm
হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ ডেজার্ট

মাসকাওয়াথ আহসান: বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত বৃটিশ শেফ নাদিয়া হুসেইন বৃটিশ রাণীর জন্মদিনের কেক বানিয়ে খ্যাত হয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষেরা নাদিয়ার সুকৃতি উদযাপন করেছিলো। সম্প্রতি নাদিয়া একটি সাক্ষাতকারে বলেছেন, বাঙালি খাদ্য সংস্কৃতিতে ডেজার্ট বা মিষ্টান্নের প্রচলন নেই। তিনি বাংলাদেশ নিয়ে তার দাদা-বাড়ির অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। সেখানে পিতামহের নাতি-নাতনীর সংখ্যা অসংখ্য। সবাই পরিমিত খাবার পেতো না। সেখানে বসার চেয়ার-টেবিল ছিলো না। নাদিয়ার দেখা জীবন বাস্তবতার প্রতি সমানুভূতি প্রদর্শন করি।

নাদিয়া একজন শেফ। তাই বাংলাদেশের খাদ্যাভাসে ডেজার্ট নেই এই মন্তব্যটি করার জন্য উনার দাদাবাড়ির অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট হবার কথা নয়। শুধু বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর সব দেশের খাদ্য সম্পর্কে একজন শেফের জানাশোনা থাকাটাই স্বাভাবিক। মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া বা এমেরিকা টিভি সিরিজে ভারতীয় উপমহাদেশসহ পৃথিবীর নানা সংস্কৃতির খাদ্য তৈরির প্রতিযোগিতা হয়। সেখানে বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার “মিষ্টান্ন” প্রতিযোগিতায় খুবই প্রশংসিত হয়। অথচ বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত নাদিয়া সে মিষ্টান্নের কথা জানতে না পারায় বিস্মিত হয়েছি। খোদ লন্ডনেই বৃটিশেরা ভারতীয়-পাকিস্তানি-বাংলাদেমি রেষ্টুরেন্টে ভিড় করে সুস্বাদু খাদ্য এবং মিষ্টান্নের রসনা তৃপ্ত করতে। গোটা পৃথিবীর ছবিটিই এরকম।

বৌদ্ধিক যুগের ভারতীয় উপমহাদেশেই প্রথম বাদামি চিনি বা ব্রাউন সুগার উদ্ভাবিত হয়েছিলো। পরে চীনারা এই চিনিকে সাদা করার পদ্ধতি আবিষ্কার করে। ইউরোপীয়রা প্রথম চিনি দেখেছিলো ভারতীয় উপমহাদেশে; সেখান থেকেই তারা চিনি/সাক্ষার/সুগার নিয়ে যায় ইউরোপে। তার আগে ইউরোপে মিষ্টান্নের বা ডেজার্টের কোনো ধারণাই ছিলো।

আর ঘরের মেঝেতে মাদুর বা ফরাশ পেতে বসা প্রাচ্যের সংস্কৃতি। চীন-জাপানে আজো তা প্রচলিত । আর বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে অষ্টব্যাঞ্জনের যে প্রথা ছিলো; তাতে মাদুর পেতে আয়েশ করে অষ্টব্যঞ্জন সহযোগে ভাত খেয়ে তারপর পায়েশ খাবার কোন বিকল্প ছিলো না। বৃটিশদের খাবার-দাবারের দিকটা অত বিলাসী ছিলো না। তাদের দুটো-তিনটা ব্যঞ্জন, রুটি আর ডেজার্টের জন্য একটি ছোট টেবিলই যথেষ্ট। খুব নির্মোহ পর্যবেক্ষণ করে একটা প্রশ্ন জাগে মনে; পশ্চিমারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষণা করে কত কিছু উদ্ভাবন করলো; কিন্তু জীবনের মৌলিক উপাদান খাদ্যের স্বাদ উদ্ভাবনে ব্যর্থ হলো কেন! বাংলাদেশে রান্নার সময়েই খাদ্যে মশলা দেয়া হয়। অন্যদিকে পশ্চিমারা টেবিলে আধাসেদ্ধ খাবার নিয়ে বসে নানারকম মশলা ছিটায় তার ওপরে। বাঙ্গালী স্বাদের কারণে পশ্চিমা খাদ্য কম স্বাদু লাগতেই পারে। কিন্তু পশ্চিমারাই যেখানে স্বীকার করে নিচ্ছেন, ভারতীয় উপমহাদেশের খাবারের স্বাদ পশ্চিমা খাবারের চেয়ে অনেক ভালো; রেষ্টুরেন্টে একটি রসগোল্লা বা গোলাপজামুন খেয়ে তৃপ্ত হচ্ছেন; তখন বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত শেফ নাদিয়া তার বাংলাদেশের মিষ্টান্নের খোঁজ পেলেন না কেন।

ডেজার্টের গতিপ্রকৃতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় ইউরোপ, আরবজগত, মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়ার মিষ্টি শুকনো প্রকৃতির। ভারতের মিষ্টান্নেই রসের শুরু আর বাংলাদেশে তার চূড়ান্ত উতকর্ষ ঘটেছে। খাদ্যে-মিষ্টান্নের ক্রমঃরুপান্তরে বাংলাদেশের খাদ্যাভাসেই সবচেয়ে বেশী রসনা আর রন্ধনশৈলীর দক্ষতা পরিলক্ষিত হয়। বার্মা (মায়ানমার) থেকে আবার শুরু হয়ে যায় রসনা নাশ।

লন্ডনে দীর্ঘদিন ধরে বাঙ্গালীরা বসবাস করছেন; বাঙালিরা যে এলাকাটিতে বসত গড়েছেন সেখানে দেশে পাওয়া যায় এমন সব খাদ্য ও মিষ্টান্নের দেখা মেলে। যে বৃটিশ রাণীর জন্মদিনের কেক বানিয়ে নাদিয়া খ্যাত হয়েছেন; সেই বৃটিশ রাজকীয় পরিবার ভোজন রসিক ভারতীয় উপমহাদেশের খাদ্যাভাস সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত।

ভারতীয় উপমহাদেশের অভিবাসী অভিভাবকেরা আপ্রাণ চেষ্টা করেন; তাদের সন্তানদের শেকড়ের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে। ইউরোপের দেশে দেশে বাঙালি নারীরা পিঠা-পুলির উতসব করেন। কী ঈদ পুনর্মিলনী; কী পুজা পুনর্মিলনী; কিংবা বিশেষ দিবসে দেশী খাদ্যের সঙ্গে দেশী মিষ্টান্ন থাকে। সুতরাং নাদিয়ার বাংলাদেশের ডেজার্ট সম্পর্কে না জানা অযৌক্তিক।

ভারতীয় উপমহাদেশের যারা পশ্চিমে জীবন সংগ্রাম করেন তারাই কষ্টে-সৃষ্টে বাঁচিয়ে রাখেন নিজস্ব সংস্কৃতিকে; আর যারা সফল মানুষ তারা শেকড় ছিঁড়ে ভোঁ দৌড় দেন ফিরিঙ্গি হতে। নিজেদের উপার্জনটি টাকায় কনভার্ট করে স্বদেশকে “বস্তি” হিসেবে ঘোষণা দেন। বাংলাদেমি বংশোদ্ভুত খ্যাতিমান লেখিকা মনিকা আলীর ব্রিকলেন স্বজাতিকে উপহাসের উপন্যাস। নিজের শেকড় বা ঐতিহ্য সম্পর্কে কোন খোঁজ না রেখে; অকস্মাত ওপরতলায় উঠে গিয়ে উঁচু গজদন্তের মিনার থেকে পিতামহ বা প্রপিতামহের গৃহটিকে দেখে; “ওরা নীচু তলার মানুষ” এমন একটি অনুসিদ্ধান্ত টেনে দেবার প্রবণতা আত্মঘাতী; এ যে নিজেকেই অন্যদের সামনে হাস্যস্পদ করে তোলা; এটা বুঝতে পারা খুবই জরুরী।

এটি কেবল কথিত সফল অভিবাসী বাঙালিদের মনোবৈকল্য নয়; দেশেও নিও এলিটেরা যারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছবি তুলে সাফল্য লাভ করেন; বা কথিত উঁচুতলায় উঠে যান; তাদের অনেকে গজদন্তের মিনার থেকে কল্পিত নীচুতলার মানুষকে দেখতে থাকেন। এদের ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশের ইতিহাস না পড়ে; ইঙ্গ-মার্কিন ইতিহাস পড়ে। ফলে এরা যে গজদন্তের মিনার তৈরী করে তার ভিত্তি দুর্বল হয়। এতে করে ভেঙ্গে পড়ে সহজে।
বাংলাদেশকে দরিদ্র জনপদ হিসেবে দেখিয়ে নিওএলিট এনজিওজীবীরাও বেশ সফল হয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বা জার্মান চ্যাঞ্চেলরের সঙ্গে ছবি তুলে দ্রুত উঠে গেছে কথিত উঁচু তলায়। সেখান থেকে কল্পিত নীচুতলায় মানুষকে নেহাত পরিসংখ্যান হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন নিওএলিটেরা।

পৃথিবীর অন্য কোন অঞ্চলের মানুষ এমন করে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আফ্রিকার ইতিহাস জানেন, নিজের দাদাবাড়ীকে নিয়ে অনেক আনন্দ প্রকাশ করেন। কালো মানুষ বলে এতোটুকু হীনমন্যতা নেই তার। অতীতকে অস্বীকার করে নিজস্ব সংস্কৃতিকে খর্ব করে দেখিয়ে নিজে বিরাট হয়ে যাওয়া; এই মনোবৈকল্য ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বোচ্চ কথিত সফল মানুষের মাঝেই বেশী দৃশ্যমান। সেখানেই আমাদের আজকের সামাজিক বিশৃংখলার কারণ তৈরী হয়েছে।

কথিত যে সফল মানুষটি অভিবাসী হলে বিদেশের ঐশ্বর্য্যের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করছেন; কিংবা দেশেই জাতে ওঠা যে লোকটি নিয়মিত কেক কাটার ছবি আপলোড করছেন; তারা সাফল্যের একটি ভুল মানদন্ড নির্ধারণ করছেন সমাজের জন্য। সমাজ তখন পড়িমড়ি করে দৌড়াচ্ছে ঐরকম সফল হতে। এরফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিদেশে টাকা পাচারে বাংলাদেশই শীর্ষে। কারণ ইলিউশানের ঘোরে সাত সমুদ্র তেরো নদী ওপারের ঘাস অনেক সবুজ মনে হয়। অথচ নিজের বাড়ীর বাইরে সবুজ ঘাসের ওপর শিশিরবিন্দু দেখা হয়না। ঘন ঘন কেকের ছবি দেখে শিশুরা নিজেদের মিষ্টান্ন-পিঠাপুলি ফেলে কেক-পেস্ট্রিতেই সাফল্যের স্বাদ পাচ্ছে।

এই যে সাফল্যের ব্রান্ডিং; এগুলো নেহাত বিজ্ঞাপন। নিজের দেশের সবুজ ঘাসের চেয়ে সুন্দর সবুজ ঘাস পশ্চিমে জন্মেনা। নিজের দেশের ডেজার্টের চেয়ে সুস্বাদু ডেজার্ট আর কোন দেশেই পাওয়া যায়না। গোলকায়নের বাস্তবতায় মানুষ পৃথিবীর নানাদেশে ছড়িয়ে পড়বে সেটাই স্বাভাবিক; নগরায়নের এই যুগে অনেক মানুষ মেট্রোপলিটানমুখী হবে সেটাই বাস্তবতা।
কিন্তু নিজের অতীত-ঐতিহ্য সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী হওয়া এবং নিজের মৌলিকত্ব ধরে রাখা খুবই জরুরী। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বহুদেশ ঘুরে যখন বলেন,
হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন;-
তা সবে,(অবোধ আমি) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ

পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি। কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি! তখন আমরা কুক্ষণে বলি যে, পশ্চিমেতে যত ডেজার্ট; বঙ্গেতে নাই।

তবে যারা পশ্চিমা দেশে থাকেন বা দেশেই পশ্চিমা সংস্কৃতি চর্চা করেন; তাদের পশ্চিমা মনোজগতের সাম্যভাবনাটি আত্মস্থ করা জরুরী। আমাদের এই যে হামবড়া হয়ে যাওয়া; হয় বলা দাদা গরীব ছিলো; দেখো সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় এতো বড় হয়েছি; মিডিয়া দর্শকের অশ্রু ঝরানোর যে সাফল্যের ন্যারেটিভ; কিংবা নিওএলিট হবার পর কৌশলে পশ্চিমাদের কাছে “নিজের দাদা জমিদার ছিলো” বলে বানিয়ে ছানিয়ে স্ট্যাটাস উত্থিত করা; এই দুটি প্রবণতাই অপ্রয়োজনীয়। পশ্চিমারা এসব নিয়ে এতো চিন্তিত নয়। বরং তারা যখন পূর্বের মানুষের সঙ্গে মেশে; তখন গভীর আগ্রহে জানতে চায় প্রাচ্যের সংস্কৃতি সম্পর্কে। পশ্চিমের মানুষকে পূর্বের মানুষ পশ্চিমা ঢং দেখিয়ে মুগ্ধ করার কোন সম্ভাবনা থাকেনা। পরস্পরের সংস্কৃতি-বিনিময়ের মাঝ দিয়েই কসমোপলিটান বা বৈশ্বিক সংস্কৃতি বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

maskaoathলেখক: প্রবাসী সাংবাদিক ও ব্লগার।

 


সর্বশেষ

আরও খবর

রাজনৈতিক কড়চায় শফী’র মৃত্যু!

রাজনৈতিক কড়চায় শফী’র মৃত্যু!


গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা

গণমাধ্যম, স্বাধীনতা এবং মিডিয়া মালিকানা


ওসি প্রদীপের বিচার ! রাষ্ট্রের দায়!!

ওসি প্রদীপের বিচার ! রাষ্ট্রের দায়!!


সীমান্ত জটিলতায় চীন-ভারত  বন্ধুত্ব

সীমান্ত জটিলতায় চীন-ভারত বন্ধুত্ব


প্রসঙ্গ:করোনা কালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অমানবিক আচরণ

প্রসঙ্গ:করোনা কালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অমানবিক আচরণ


ভোটের ঈমান বনাম করোনার ঈমান

ভোটের ঈমান বনাম করোনার ঈমান


কালের হিরো খন্দকার খোরশেদ

কালের হিরো খন্দকার খোরশেদ


করোনাকালের খোলা চিঠি

করোনাকালের খোলা চিঠি


সিগেরেট স্মৃতি!

সিগেরেট স্মৃতি!


পাঠকের-জনতার ‘মিটেকড়া-ভীমরুল’ এবং একটি পর্ট্রেট

পাঠকের-জনতার ‘মিটেকড়া-ভীমরুল’ এবং একটি পর্ট্রেট