Sunday, August 23rd, 2020
১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে
August 23rd, 2020 at 10:51 pm
পৃথিবীর ইতিহাসে (আওয়ামী লীগের মতো) সাংবিধানিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং একই সঙ্গে নির্বাচনে জয়ী কোনো রাজনৈতিক দলের সামরিক শাখা (military wing) থাকার ইতিহাস নেই।
১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানে

অধ্যায় : ১৯৭১ জানুয়ারি থেকে ২৬ মার্চ

পটভূমি : ‘১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়ী হলো। ফলে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। যার ফলে সাংবিধানিকভাবে বঙ্গবন্ধুই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করেন’(মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর একটি নির্দলীয় ইতিহাস, গোলাম মুরশিদ)। সেই সময় ঢাকা রেডিও এবং টিভিতেও বঙ্গবন্ধুর নামের আগে ‘দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এবং পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী’ বিশেষণ ব্যবহার করা হতো। যদিও ভেতরে ভেতরে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা ছুতো খুঁজতে থাকেন এই নির্বাচনের রায় বানচাল করার জন্য। ১ মার্চ পাকিস্তানি শাসকরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি ঘোষণা করলে সমগ্র বাঙালি জাতি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। পাকিস্তানি শাসকরা আশা করছিল বঙ্গবন্ধু তাদের এই উসকানিতে ফাঁদে পা দেবেন এবং হঠকারী কিছু করবেন। ফলে বিশ্বে বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে প্রমাণ করা খুবই সহজ হবে এবং সংসদ বাতিল করে সামরিক শাসন অব্যাহত রাখা যাবে।

বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। তিনি রাজনৈতিকভাবে ৬ দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম করছিলেন (৬ দফার মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্কটল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসনের অনেক আইনগত মিল দেখা যায়)। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং ৭ জুনের আত্মত্যাগ, ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে গণজাগরণ হয়, তাকে বঙ্গবন্ধু আহরণ করেন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ব্যালট বক্সের মধ্যে এবং এরই মধ্য দিয়ে

বাঙালির স্বাধিকারের দাবি সাংবিধানিক বৈধতা লাভ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে (আওয়ামী লীগের মতো) সাংবিধানিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং একই সঙ্গে নির্বাচনে জয়ী কোনো রাজনৈতিক দলের সামরিক শাখা (military wing) থাকার ইতিহাস নেই।

কমিউনিস্ট পার্টির সামরিক শাখা (military wing) থাকতে পারে, কারণ কমিউনিস্টদের মন্ত্রই হচ্ছে ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’ (মাও সে তুং)। পক্ষান্তরে অনেক সশস্ত্র আন্দোলনরত দলের রাজনৈতিক শাখা (পলিটিক্যাল উইং) আছে। যেমন আইরিস রিপাবলিকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা (পলিটিক্যাল উইং) হচ্ছে Sinn Fein.. লেবাননের হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক শাখা (পলিটিক্যাল উইং) আছে এবং লেবাননের সংসদে তাদের উপস্থিতি এই রাজনৈতিক শাখার (পলিটিক্যাল উইং) মাধ্যমেই। তাই আওয়ামী লীগের মতো সাংবিধানিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং একই সঙ্গে নির্বাচনে জয়ী কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি না থাকাটাই স্বাভাবিক।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুরে ইয়াহিয়া খানের পার্লামেন্টের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি খুবই দ্রুত বদলে গেলে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বাধীন (যারা ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস নামে পরিচিত ছিল) ছাত্রলীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য দাবি তোলেন এবং বঙ্গবন্ধুর ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। তাদের চাপের মুখে বঙ্গবন্ধু যদি ৭ মার্চ ভুল সিদ্ধান্ত নিতেন, তাহলে দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল ভেস্তে যেত তা বলাই বাহুল্য। কারণ পাকিস্তানি শাসকরা এই ধরনের একটি ছুতোর অপেক্ষায়ই ছিল। স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মাথায়ই ১৯৭২ সালে আমরা দেখতে পেয়েছিলাম, এই সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই আরেকটি হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে জাসদ এবং গণবাহিনী তৈরি করে, যার দুঃখজনক এবং মর্মান্তিক পরিণতি আমরা ৭০-এর দশকে দেখতে পেয়েছি। সেই হঠকারী নেতৃত্বের অবশিষ্টাংশ সিরাজুল আলম খান, রব, শাজাহান সিরাজ, হাসানুল হক ইনুর রাজনৈতিক পরিণতি আজ সবারই জানা।


 
এই অধ্যায়ে জনাব এ কে খন্দকার ১৯৭১ জানুয়ারি থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ঘটনাবলির ওপর নি¤েœাক্ত কয়েকটি বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, যা অনেক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে এবং অনেকেই আমাকে অনুরোধ করেছেন এসব মন্তব্য বিশ্লেষণ করতে।

জনাব এ কে খন্দকার সাহেবের অভিযোগ ‘৭ মার্চের ভাষণে কীভাবে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে তা বঙ্গবন্ধু পরিষ্কার করেননি!’ একই সঙ্গে বলেছে, ‘আওয়ামী লীগের পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় যুদ্ধ শুরু করার কথা বলাও একেবারে বোকামি হতো। ‘তিনি যুদ্ধের ডাক দিয়ে বললেন জয় পাকিস্তান’ (পৃ. ২৯-৩২)!

বিশিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার জনাব শাহাব ফারুক কখনো রাজনীতি করেন নাই বা কোনো দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। ১৯৭১ সালের ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির ছাত্র জনাব শাহাব ফারুক, ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন। জয় পাকিস্তান সম্পর্কে তার ভাষ্য নিচে উদ্ধৃত করা হলো, ‘

“I was present in that famous Race Course meeting sitting very
near from the Podium together with my BUET friends, this is
just a blatant lie.”

প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ইতিহাসবিদ সালাহউদ্দীন আহমেদ তার জীবনের শেষ প্রবন্ধে লিখেছেন, “আমি এবং আমার মতো অগণিত লোক যারা রেসকোর্স ময়দানে সেই জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শেখ সাহেবের জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনছিলাম, তারা শুনলাম, বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা শেষ করলেন ‘জয় বাংলা’ বলে”।

কেউ কেউ বলেন, “তিনি বক্তৃতা শেষ করেন ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলে”। কিন্তু টেলিভিশন কেন্দ্রে তার বক্তৃতার যে ভিডিও ছিল তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেও এই অপবাদের কোনো সমর্থন পাওয়া যায়নি (মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর একটি নির্দলীয় ইতিহাস, গোলাম মুরশিদ পৃ. ৭১-৭২)।

আমিও মনে করি, বঙ্গবন্ধু যদি ‘জয় পাকিস্তান’ বা ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলে ভাষণ শেষ করতেন, তাহলে কি পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ ২৫ মার্চের পর বঙ্গবন্ধু যখন আটক, তখন যুদ্ধরত বাঙালি জাতিকে বিভ্রান্ত করার জন্য বার বার রেডিওতে সেই ‘জয় পাকিস্তান’ বা ‘জিয়ে পাকিস্তান’ অংশটি প্রচার করত না?

তিনি আবার একটু পরই লিখেছেন, ‘যদি আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো পরিকল্পনা থাকত, তবে হয়তোবা যুদ্ধটি অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যেত (পৃ. ৩২)। ‘সত্যি কথা বলতে কি, আমরা রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে কোনো নির্দেশ পাইনি (পৃ. ২৯)’। বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল (পৃ.৪৪) হচ্ছে তিনি যদি নির্দেশ দিতেন তাহলে অনেক অল্প রক্তক্ষয়েই দেশ স্বাধীন হয়ে যেত! ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের নেতৃত্বে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা পরিকল্পনা করেছিল (পৃ. ৪৫)।


প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ইতিহাসবিদ সালাহউদ্দীন আহমেদ লিখেছিলেন, ‘বন্ধুবর বদরুদ্দীন উমর এ কে খন্দকারের বইয়ের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন: ‘তিনি (শেখ মুজিব) যদি জনগণের ওপর নির্ভরশীল হতেন এবং সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন, তাহলে ৭ মার্চ রেসকোর্সের ময়দানের বক্তৃতার শেষে দেশের লোককে ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরির আহ্বান না জানিয়ে এবং বক্তৃতার শেষে ‘জয় পাকিস্তান’ না বলে ওই মহাসমাবেশেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে সমবেত লাখ লাখ মানুষকে ক্যান্টনমেন্টের দিকে পরিচালিত করতেন এবং বাঙালি সামরিক লোকদের ক্যান্টনমেন্টের দখল নেয়ার আহ্বান জানাতেন। শেখ মুজিব যদি উমরের কথামতো লাখো জনতা নিয়ে ঢাকা বিমানবন্দর ও ক্যান্টনমেন্ট দখল করার চেষ্টা করতেন, তাহলে অবাঙালি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোকেরা সংখ্যায় যতই কম হোক তাদের হাতে প্রচুর ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ ছিল, তারা নির্বিচারে কামান দেগে শেখ মুজিবসহ লাখো বাঙালিকে হত্যা করত। বাইরের কোনো শক্তি আমাদের রক্ষা করতে আসত না। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতো। আমরা চিরদিনের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানিদের গোলাম হয়ে থাকতাম।’

বঙ্গবন্ধু সেদিন সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে, যে সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর সামনে লাখো মানুষ শুধু ‘কামানের খোরাক’- ((cannon fodder) পরিণত হতো, তা পরবর্তী সময়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট দখলের হঠকারী প্রচেষ্টা এবং তার মর্মান্তিক পরিণতি এই যুক্তির বাস্তবতা প্রমাণ করে (রংপুর সেনানিবাসে দুঃসাহসিক আক্রমণ, কাজী সাজ্জাদ আলি জহির; এবং যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা, মেজর নাসিরউদ্দীন)। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করে, স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের পরিষ্কারদিক-নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি তো বলেছিলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল’ ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি…’ ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে বিকল্প সরকার গঠন এবং ধাপে ধাপে সশস্ত্র সংগ্রামের পটভূমি প্রস্তুত করেছিলেন।

এখন চলুন ব্রিগেডিয়ার মজুমদার এবং চট্টগ্রামের সামরিক অফিসারদের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে। আমি ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা অবস্থানকালে তিনদিন প্রয়াত আমিন ভাইয়ের (মেজর জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরী) সঙ্গে তার গুলশানের বাসায় এবং ‘প্রথম আলো’ অফিসে মুক্তিযুদ্ধের চট্টগ্রামভিত্তিক ইতিহাস ও মেজর হায়দার বীরউত্তমের শেষ দিনগুলি প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করি। আমিন ভাই তখন ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ নামের বই রচনায় ব্যস্ত ছিলেন। আমিন ভাই আমাকে তার বাসায় ’৭৫-এর নভেম্বরে মেজর হায়দারের মোটরসাইকেল রেখে যাওয়া সম্পর্কে অবহিত করেন; এবং মিসেস নীলুফার হুদার (৭ নভেম্বরে উচ্ছৃঙ্খল সিপাহীদের হাতে নিহত শহীদ কর্নেল নাজমুল হুদা বীরউত্তমের স্ত্রী এবং ‘কর্নেল হুদা এবং আমার যুদ্ধ’র লেখিকা) ফোন নম্বর সংগ্রহ করেন এবং আমাকে মিসেস হুদার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আমিও ‘মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার এবং তার বিয়োগান্ত বিদায়’-এর লেখক মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলামের সঙ্গে তার গবেষণার স্বার্থে ফোনে মিসেস হুদা এবং আমিন ভাইয়ের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম।

১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের সঙ্গে আমিন ভাইও ঢাকায় আসেন। তিনি কখনই ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের নেতৃত্বে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা পরিকল্পনা করেছিল এই ধরনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেননি। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে অবস্থিত বাঙালি অফিসারদের (যেমন ব্রিগেডিয়ার মজুমদার স্বয়ং, কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম, শমসের মবিন চৌধুরী বীরবিক্রম, মীর শওকত আলী বীরউত্তম, জিয়াউর রহমান বীরউত্তম) কেউই কখনো এ ধরনের কোনো পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেননি। আমি জানি না, জনাব এ কে খন্দকার কোন সূত্র থেকে এ ধরনের পরিকল্পনার কথা জানতে পেরেছিলেন!

২৫-২৬ মার্চের রাতের ঘটনাবলিই প্রমাণ করে, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কারণ ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে যদি এ ধরনের পরিকল্পনা করা হতো বা এমনকি পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রাথমিক আলোচনাও হয়ে থাকত, তাহলে ২৫ মার্চ রাতে ৮০০ বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্য সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ইবিআরসিতে অবস্থানরত ২০০০ বাঙালি সৈন্যকে হত্যা করতে পারত না (লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম)। ইতিহাসই প্রমাণকরে, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে অফিসার বা সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহের ন্যূনতম প্রস্তুতিও ছিল না। বরং ২৫ মার্চে চট্টগ্রামে অবস্থিত অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের জনৈক সিনিয়র বাঙালি অফিসারের বিরুদ্ধে ‘অন্তর্ঘাত’ এবং প্রতারণার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে (অন্তর্ঘাত ১৯৭১, মানিক চৌধুরী)! জেনারেল নিয়াজীর ভাষায়, ‘চট্টগ্রাম ছিল প্রতারণামূলক স্থান (নিয়াজীর আত্মসমর্পণের দলিল, সিদ্দিক সালিক)।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং দেশনায়ক, তিনি বাস্তবতা বুঝতেন, তাই বিভিন্ন মহলের শত চাপ, প্রলোভন অথবা উসকানির মুখে এবং একই সঙ্গে ফাকা আশ্বাসে আবেগতাড়িত বা অনুমাননির্ভর হয়ে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেননি। পরবর্তী উদাহরণগুলোর মাধ্যমে তা দিবালোকের মতোই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি অফিসারদের মধ্যে কয়জন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন তা একটু খতিয়ে দেখলেই ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হবে। জনাব এ কে খন্দকার বইয়ের ৩৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন ২২ মার্চ মেজর জেনারেল ইশফাকুল মজিদ (অব. প্রাপ্ত) কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে প্রদত্ত আশ্বাসের কথা, ‘হে বঙ্গবন্ধু, বাংলার স্বাধীনতা কী করে আদায় করতে হয় আমরা তা জানি।’ বঙ্গবন্ধু যদি এই সকল আশ্বাসের ওপর বিশ্বাস করতেন, তাহলে যে কত ভুল করতেন তা সমগ্র মুক্তিযুদ্ধে মেজর জেনারেল ইশফাকুল মজিদের (অব. প্রাপ্ত) অনুপস্থিতিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।


২৫ মার্চের হত্যাকান্ড নিজের চোখে দেখার পরও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি অফিসারদের মধ্যে ২০% মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন! শান্তিবাগে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এক মেজর এনাম রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন (নক্ষত্রের রাজারবাগ, মোশ্তাক আহমেদ)। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় তিনিও (পরবর্র্তীতে ব্রিগেডিয়ার, যার নামে ‘এনাম কমিশন’ গঠিত হয়) পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান।

বাংলাদেশে অবস্থানরত একমাত্র বাঙালি কমান্ডিং অফিসার (সিও) লে. কর্নেল রেজাউল জলিল তার অধীনস্থ প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে বিদ্রোহ না করার ফলে প্রথম বেঙ্গলকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করতে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২৫-২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্ট যশোর ক্যান্টনমেন্টের বাইরে প্রশিক্ষণের জন্য অবস্থান করছিল; কিন্তু কমান্ডিং অফিসার (সিও) কর্নেল রেজাউল জলিলের নির্দেশে তারা যশোর ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসেন। সেনানিবাসে আসার পর রেজাউল জলিল তাদের সবাইকে অস্ত্র জমা দিতে বলেন! তারপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বীরউত্তম লে. আনোয়ার সেদিন শহীদ হন (একাত্তরের বীরযোদ্ধা, প্রথম খন্ড-, সম্পাদক মতিউর রহমান)। অন্য বাঙালি কমান্ডিং অফিসার (সিও) ৭ বেঙ্গল এইচ. এম এরশাদ ১৯৭১ সালে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে আসলেও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি!

কুমিল্লায় অবস্থানরত কমান্ডো মেজর মান্নান (পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার সরকারের বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী!) চট্টগ্রামে বাঙালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং আহত হয়েছিলেন! রংপুর ক্যান্টনমেন্টে বাঙালিরা সরাসরি আক্রমণ করতে গিয়েছিল এবং কয়েক হাজার মানুষ শহীদ হয়েছিল, সেই হত্যাযজ্ঞের নেতৃত্বে ছিল আরেক কুলাঙ্গারবাঙালি অফিসার (যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা, মেজর নাসির)। লে. কর্নেল ফিরোজ সালাহউদ্দীন (স্বাধীনতা উত্তর ব্রিগেডিয়ার) রাজাকার নিয়োগের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় (একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর, কর্নেল শাফায়াত জামিল)।

জনাব এ কে খন্দকার সাহেব না জানলেও বঙ্গবন্ধুর ভালো করেই ধারণা ছিল, নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য কতদিনের প্রশিক্ষণ আর কী পরিমাণ অস্ত্রের প্রয়োজন। আমাদের দেশের সমতলভূমিতে ট্যাংক এবং বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র ছাড়া সম্মুখযুদ্ধ তো দূরের কথা, গেরিলা যুদ্ধেও সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গে নকশালদের ব্যর্থতা এর চাক্ষুষ প্রমাণ। ৭ মার্চে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণার নির্দেশ না দেয়া ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং বিচক্ষণতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমাদের সবারই মনে রাখা উচিত যে, ৭ মার্চ ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এবং ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী; তিনি কোনো
কলেজ বা ভার্সিটির পাতি নেতা বা মেজর/ক্যাপ্টেন-এর মতো জুনিয়র (see warrant of precedence) সামরিক অফিসার ছিলেন না।

১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সৈন্য অপেক্ষাকৃত কম থাকলেও খুব একটা কম ছিল না। তার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই সময় সমগ্র কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল, যোগাযোগ, আর্টিলারি, ট্যাংক, নেভি এবং এয়ারফোর্সের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ছিল পাকিস্তানিদের হাতে। শুধু সংখ্যার আধিক্যই যদি যুদ্ধে জয়ী হওয়ার একমাত্র কারণ হতো, তাহলে ৩ হাজার ইংরেজ, ৩০ কোটি ভারতীয়কে ১৯০ বছর পরাধীন রাখতে পারত না। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে ইংরেজরা খুব সহজেই পরাজিত হতো!

বঙ্গবন্ধু বা অন্য কারো পক্ষেই ২৫ মার্চের ভয়াবহতা অনুমান করা সম্ভব ছিল না। ২৫ মার্চ রাতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে অকল্পনীয় হত্যাকা- চালায় তা যে কারো অনুমানের অনেক বাইরে ছিল। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাল থেকে ২৪ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত’ ১৯ বছরে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর হাতে সারা দেশে বিভিন্ন আন্দোলনে নিহতের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ২০০-৩০০। ২৫ মার্চ রাতে শুধু ঢাকা শহরেই নিহতের সংখ্যা ছিল তার চেয়ে শতগুণ, কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ হাজার!

খন্দকার সাহেব আরও বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ২৫ মার্চ রাত্রে চলে যাওয়ার সুযোগ ছিল!’ ২৫ মার্চ রাত্রে যদি বঙ্গবন্ধু চলে যেতেন, তাহলে তিনি হয়তো আবার প্রশ্ন করতেন, ‘নিরস্ত্র মানুষ’কে চরম বিপদের মধ্যে ফেলে বঙ্গবন্ধু পালিয়ে গেলেন কেন?’


তথ্যসূত্র : ১. মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর একটি নির্দলীয় ইতিহাস, গোলাম মুরশিদ, ২. একাত্তুরের গেরিলা, জহিরুল ইসলাম, ৩. গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে, মাহবুব আলম, ৪. একাত্তুরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা, মেজর হামিদুল হোসেন তারেক বীরবিক্রম, ৫. জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা, মেজর কামরুল ইসলাম ভুইয়া, ৬. একাত্তর স্মরণে, ডা. বেলায়েত হুসাইন, ৭. একাত্তুরের জীবনযুদ্ধ, শামসুল ইসলাম সাইদ, ৮. স্বাধীনতা ৭১, কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, ৯. যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা, মেজর নাসিরউদ্দীন, ১০. একাত্তর আমার, মোহাম্মদ নুরুল কাদের, ১১. অন্তর্ঘাত ১৯৭১, মানিক চৌধুরী, ১২. তাজউদ্দীন আহমেদ নেতা ও পিতা, শারমিন আহমেদ, ১৩. একাত্তুরের দিনগুলি, জাহানারা ইমাম, ১৪. একাত্তুরের বীরযোদ্ধা, প্রথম খণ্ড- সম্পাদক মতিউর রহমান, ১৫. কর্নেল হুদা এবং আমার যুদ্ধ, নীলুফার হুদা, ১৬. অন্তর্ঘাত ১৯৭১, মানিক চৌধুরী, উন্মেষ প্রকাশনী, সেক্টর-৩, উত্তরা, ঢাকা, ১৭. নিয়াজীর আত্মসমর্পণের দলিল, সিদ্দিক সালিক : ভাষান্তর মাসুদুল হক, ১৮. লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম, ১৯. একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর, কর্নেল শাফায়াত জামিল, ২০. রংপুর সেনানিবাসে দুঃসাহসিক আক্রমণ, কাজী সাজ্জাদ আলি জহির. (চলবে..১৯৭১ ভেতরে বাইরে সত্যের সন্ধানেনাজমুল আহসান শেখ.)



সর্বশেষ

আরও খবর

ভাইরাসের সাথে বসবাস

ভাইরাসের সাথে বসবাস


মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান


লন্ডন ফিরছেন আইএস বধু ব্রিটিশ-বাংলাদেশী শামীমা বেগম!

লন্ডন ফিরছেন আইএস বধু ব্রিটিশ-বাংলাদেশী শামীমা বেগম!


তাসের ঘর : দুর্দান্ত স্বস্তিকায় নারীমুক্তি?

তাসের ঘর : দুর্দান্ত স্বস্তিকায় নারীমুক্তি?


সৌন্দর্যসেবায় আয় কমেছে সবার: বেকার ৪০ শতাংশ উদ্যোক্তা-কর্মী

সৌন্দর্যসেবায় আয় কমেছে সবার: বেকার ৪০ শতাংশ উদ্যোক্তা-কর্মী


স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন

স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন


শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!

শিশু ধর্ষণ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বিষফোঁড়া’ নিষিদ্ধ!


সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!

সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে এলেন বেলারুশের সাংবাদিকেরা!


লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ

লুণ্ঠন ঢাকতে বারো মাসে তেরো পার্বণ


বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃ জিয়া-এরশাদ-খালেদা কর্তৃক খুনিচক্রের স্বার্থরক্ষা

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃ জিয়া-এরশাদ-খালেদা কর্তৃক খুনিচক্রের স্বার্থরক্ষা