Tuesday, September 20th, 2016
৯/১১’র মূল্য দিতেই হচ্ছে মুসলিমদের!
September 20th, 2016 at 9:08 pm
৯/১১’র মূল্য দিতেই হচ্ছে মুসলিমদের!

কাজি ফৌজিয়া:

প্রিয় বন্ধু,

কেমন আছো তুমি? আমি আমার মতোই আছি এই জনারণ্যে। মানুষ নিয়ে থাকি, কারণ একলা থাকা আমার পছন্দ না। আমি জেনে গেছি, দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত আমাকে একাই থাকতে হবে, তাই হয়ত এত চেষ্টা আমার মানুষ নিয়ে থাকার কারণ।

বন্ধু, তুমি তো জানো, তোমার কাছে লেখা চিঠি একটা অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অনেক পাঠক, আমার বন্ধু, মতামত দিল গত কয়েকটা চিঠিতে আমার নাকি আবেগ কমে গেছে! ভাবি, আমার আবেগ ছিলো কবে? আবেগ থাকলে কি আর আমি একা হতাম! কেউ না কেউ তো থাকতো। আমি দেরিতে বাড়ি ফিরলে কেউ না কেউ তো আমার জন্য চিন্তা করতো। আমার অসুখ বিসুখে কেউ না কেউ তো কপালে হাত রাখতো। এই দেখো, আহা আমিও কেমন আবেগ-প্রবণ হয়ে যাচ্ছি।

বন্ধু, আজ আমি কথা বলবো ৯/১১ নিয়ে। এবছর ৯/১১ ঘটনার ১৫ বছর পূর্ণ হলো। সেদিন কী ঘটেছিলো সকলেই কম বেশি জানি। সেই ঘটনায় পুরো দুনিয়ার মুসলিম আর অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ নীতি চালু করে আমেরিকা। সন্ত্রাস রোধের নামে আমেরিকা অনেক দেশ আক্রমণ করে। দেশে দেশে ড্রোন হামলা শুরু করে। আমেরিকার নতুন নতুন শত্রুর যেমন অভাব নেই নতুন স্টাইলে আক্রমণ আবিষ্কারেরও অভাব নেই। ড্রোনের পরে এখন তারা এয়ারস্টিক ব্যবহার করছে। অবস্থা দেখে মনে হয় একজন ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠি ৯/১১র জন্য দায়ী নয়! পুরো মুসলিম উম্মাহ দায়ী! আর জন্য অনন্ত কাল ধরে এর মূল্য দিতে হবে মুসলমানদের। সেদিন যে দাড়িওয়ালা লোক বা তার দল কে ৯/১১র জন্য দায়ী করা হয় সে যখন ১৯৭৯-এ আফগানিস্তানে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, এই আমেরিকাই তার দল কে টাকার যোগান দেয়। আর ২০০১-এ সে এতো বড় শত্রু হয়ে যায় যে, আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করে বসে।

৯/১১ হামলায় ২৯৯৬ মানুষ প্রাণ হারায়। সাদা, কাল, হিস্পেনিক, মুসলিম, এশিয়ান, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি, বাঙালী সবাই তাদের প্রিয়জন হারায় সেদিন। তবু অজানা কারণে আজ অবধি আমেরিকার বাইরে ও আমেরিকার ভিতরে মুসলমানদেরই ৯/১১র মূল্য দিতে হচ্ছে। ৯/১১র জের ধরে এখন পর্যন্ত ৪ মিলিয়ন উপর মানুষ আফগানিস্তান আর ইরাকে হত্যা করা হয়েছে। আর আমেরিকার ভিতরে ২০০২ সালে ‘এটর্নি জেনারেল অফ আমেরিকা স্পেশাল রেজিস্টেশন’ কার্যক্রম চালু করে। তাতে করে ২৫ টি দেশ থেকে আগত অভিবাসীদের ফেডারেল প্লাজায় গিয়ে নাম নিবন্ধন করতে হয়। এরমধ্যে ২৪ টি মুসলিম দেশ আর একটি হলো উত্তর কোরিয়া ।

ওই নিয়মে ৮০,০০০ হাজার অভিবাসী নাম নথিবদ্ধ করে। আর ১৩ হাজার মানুষকে ইমিগ্রেশনের কাগজ নেই বলে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয় আমেরিকা। সন্ত্রাসবাদ খুঁজে বেড়ানোর নামে এই তালিকা করা হলেও সেখানে এর উপস্থিতি ছিল ‘শূন্য’।

বন্ধু আগের কটি চিঠিতে আমি পাতানো মামালায় মুসলিমদের ফাঁসানোর কথা বলেছি, সেই নীতির জন্মও তখন থেকে। আমাদের সংগঠনের পাকিস্তানি সদস্য শাহিনা আপার ছেলে মতিনের পিছনে গুপ্তচর লাগিয়ে রাখা হয় ১ বছর। গুপ্তচরকে ১ লাখ ডলার প্রদাণ করে কেস বানানো হয়। মতিনের আই কিউ কম। ১৭ বছরের মতিন ১১ বছরের বালকের মতো চিন্তা করে। মতিন একটি ইসলামিক বইয়ের দোকানে কাজ করতো। গুপ্তচর ঐ দোকানে প্রতিদিন এসে আড্ডা দিতো আর মতিনকে ইরাক ও আফগান যুদ্ধে আমেরিকান সৈন্যদের অত্যাচারের ছবি দেখাতো। গুপ্তচর বলতো আমেরিকা এটা ঠিক করেনি। একটা কিছু করা দরকার। এক বছরে মতিনের মগজ ধোলাই করে গুপ্তচর প্রতিশ্রুতি আদায় করে যে, মতিনকে সে বোমা দিবে, আর মতিন তা হারল্ড স্কয়ার পার্ক সাবওয়ে ম্যানহাটনে রেখে আসবে।

যেদিন বোমা রাখার কথা তার আগের রাতে মতিন তার মায়ের কাছে বিষয়টি খুলে বলে! মতিনের মা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, তবে ছেলেকে এটা বোঝাতে সক্ষম হন যে ওই লোক খুব খারাপ। মতিন সাথে সাথে গুপ্তচরকে ফোন করে গালি দেয় আর বলে ‘তুমি খুব খারাপ আর কখনো আসবে না।’ কম বুদ্ধি বলেই মতিন তার মাকে জানিয়েছিল আর গুপ্তচরকে ফোন করে সরাসরি গালি দিয়েছিল। তবুও থেমে থাকেনি গুপ্তচর। সে ১৬ দিনের কথোপকথন জমা দেয় পুলিশকে, আর মতিন কে ফাঁসিয়ে দেয় মিথ্যা মামলায়। ২০০৪ সালে মতিন কে বুক শপ থেকে এমন ভাবে গ্রেপ্তার করে যা দেখে মনে হয় বিশাল আতঙ্কবাদী ধরে ফেলেছে পুলিশ। অসহায় মতিনের মা টিভির খবরে দেখতে পায় তার ছেলে কত বড় আতঙ্কবাদী। তার একবছর পর মতিনের সাজা হয় ৩০ বছরের। সাজার দিন রাতে শাহিনা আপা তার মেয়ে ও স্বামীকে ইমিগ্রেশন পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। আমাদের সংগঠন লড়াই করে ফ্যামিলিকে ছাড়িয়ে আনে। পরে গুপ্তচর এর পাঠানো একটি চিঠির মাধ্যমে আমরা জানতে পারি তাকে নাকি নিউইয়র্ক পুলিশ ২ লক্ষ ডলার দেয়ার কথা বলেছিল, দেয়নি!

১১ বছর ধরে মতিনের মা আমাদের সাথে মাঠে, ময়দানে, ক্যাপিটাল হিলে পুলিশ প্লাজায়, সিটি হলে বক্তৃতায় ও সাক্ষাৎকারে নিজের কাহিনী তুলে ধরছে। শাহিনা পাকিস্তানে নার্স ছিলেন। একটি সুন্দর জীবনের আশায় এই দেশে আসেন আর এই দেশ তাকে দিয়েছে পাকিস্তানি মুসলিম হওয়ার শাস্তি। বাংলাদেশের কাজী নাফিস ছাড়াও আছে ফাহিম সিদ্দিকি ও মোহাম্মদ হুসেন। এই রকম ২০০ কেস এর কাহিনী বই আকারে লিপিবদ্ধ আছে।

বন্ধু, তোমাকে যখন লিখছি তখনই খবর এলো নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে বোমা বিষ্ফোরণ হয়েছে। আহত ২৯ জন। টিভি খুলে খবরে দেখলাম মেয়র সংবাদ সম্মেলন করছেন। নিউ জার্সিতেও একটা বোমা বিষ্ফোরণ হয়েছে, সেখানে কেউ আহত হয়নি। ২৭ নম্বরের রাস্তায় আরেকটা পাওয়া গেছে। হাত চলছে না, কি লিখবো। যখন এমন কিছু হয় তখনই মনে হয় এই বুঝি খবরে দেখাবে আতঙ্কবাদী ধরা পড়েছে; আর সে হলো মুসলিম! আমরা আমেরিকার মানবাধিকারকর্মীরা যে কোনো ঘটনার পর দোয়া করতে থাকি আল্লাহ মুসলিম, বাংলাদেশী, পাকিস্তানী, কালো বা অভিবাসী যেন না হয়।

বন্ধু, গত চিঠি লেখার পরেও ৩ জন মুসলিম নারী হেইট ক্রাইমের শিকার হয়েছেন। শত বঞ্ছনার মাঝেও নিউ ইয়র্কে আমাদের সমাজ ঈদ পালন করল। ঈদের জামাতে মেয়র এসেছিলো সংহতি জানাতে। আমার অনেক বন্ধু খুব গর্বিত ভাবে মেয়রের সাথে নিজের ছবি ফেইস বুকে পোষ্ট দিয়েছে, দেখে মনে হচ্ছিল মেয়র আসাতে আমাদের সব অপমান শেষ!

বন্ধু, আজকাল সামাজিক মাধ্যমে অনেক মেয়ের লেখা চোখে পড়ে। আমি মাঝে মাঝে পড়ি সেসব। সবাই কত সুন্দর ভাষায় নারীবাদের কথা বলে। মেয়েদের জন্য তৈরি সামাজিক বৈষম্যের কথা বলে। কেউ কেউ হয়তো সুন্দর কবিতা লেখেন, গল্প লেখেন। আর তোমাকে আমার চিঠিতে আমি শুধু সিস্টেম আর নীতি নিয়ে সমালোচনা করি, সমাজের মানুষকে কটাক্ষ করি। কী করব বন্ধু মানুষের কষ্ট নিয়ে কাজ করতে করতে সুন্দর কথা আর গঠনমূলক লেখা আসে না আমার। তাই তো বলি, ‘প্রেমের কবিতা তোমরা লিখ বন্ধু যাহারা আছ সুখে।’

ভালো থাকো বন্ধু। ভালো থাকুক আমার দেশ ও দেশের মানুষ।

ইতি
তোমার বন্ধু যাকে তুমি কোনো নামেই ডাকো না।


সর্বশেষ

আরও খবর

মানবিক হও!

মানবিক হও!


সহমর্মিতার জয় হোক

সহমর্মিতার জয় হোক


মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন

মহামারীর এই সময়ে মানুষের পাশে থাকুন


আসছে শুভদিন!

আসছে শুভদিন!


আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম

আমাদের ঝালমুড়ি দাদা ও গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম


জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়

জন্মভূমির টান মানসিক কষ্টে ফেলে দেয়


‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’

‘মুসলিম সমাজের বিভাজন বন্ধ করুন’


আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে

আজ জুইস-মুসলিম এক কাতারে দাঁড়িয়েছে


সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

সর্ব পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে


ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি

ভাবতেই কষ্ট হয় আমিও বাঙালি