Tuesday, July 5th, 2016
কমরেড ফরহাদের ৭৮ তম জন্মবার্ষিকী আজ
July 5th, 2016 at 4:47 am
কমরেড ফরহাদের ৭৮ তম জন্মবার্ষিকী আজ

ডেস্কঃ তার রাজনৈতিক ছদ্মনাম ছিল ‘কবির’। বন্ধুস্থানীয়দের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘বাংলার লেলিন’ নামে। অগ্রজেরা সম্বোধন করতেন ‘কমরেড’ বলে। কারো কারো কাছে পরিচিত ছিলেন ‘নাস্তিক’, ‘রাশিয়ার দালাল’ বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে। ’৫২ এর মহান ভাষা আন্দোলন থেকে বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ অতিক্রম করে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনে সংগঠকের ভূমিকায় তার আত্মত্যাগ অনস্বীকার্য। মাত্র ১৬ বছর বয়সে মার্ক্সবাদ ও লেলিনবাদের দীক্ষা নিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের কুখ্যাত নিরাপত্তা আইনে বিনা বিচারে জেল খাটেন আট মাস। ১৭ বছর বয়সে লাভ করেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মধ্যে উপেক্ষিত এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে অপিরিচিত এই নেতা একাধারে সাংবাদিক, শিশু সংগঠক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি, জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্য এবং বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোহাম্মদ ফরহাদ।

কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ ১৯৩৮ সালের আজকের দিনে, অর্থাৎ ৫ জুলাই তারিখে পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আহমেদ সাদাকাতুল বারি এবং মা তৈয়বুন্নেসা। তিনি ১৯৫৩ সালে দিনাজপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা, সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও গ্রাজুয়েশন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম এ ডিগ্রী অর্জন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় কমরেড ফরহাদ ১৯৫৯ সাল থেকে গোপনে ছাত্রদের সংগঠিত করতে থাকেন, ১৯৬২ সাল থেকে প্রায় এক বছর হুলিয়া মাথায় নিয়ে গোপনে ছাত্র গণআন্দোলন সংগঠন ও শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তার অবদান অপরিসীম। মুক্তিযুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টি-ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর প্রধান সংগঠক ছিলেন। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি, তার নেতৃত্বে প্রায় ২০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ঢাকা স্টেডিয়ামে এক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর নিকট অস্ত্র সমর্পণ করেন।

কলেজ জীবন থেকে সকল যৌক্তিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত এই মহামতি নেতা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। জিয়ার শাসনামলে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি-সিপিবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কমরেড ফরহাদকে কারাবন্দি করে জিয়া সরকার। তবে ১৯৭৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশেই তিনি মুক্তিলাভ করেন। একই সরকারের আমলে ১৯৮০ সালে পুনরায় ফরহাদকে গ্রেফতার করা হয় রাষ্ট্রদ্রোহের তথাকথিত অভিযোগে। কিন্তু চৌদ্দ শিক তাকে আটকে রাখতে পারেন বেশীদিন, পরের বছর মুক্তি পেয়ে যান তিনি। জিয়া সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর ক্ষমতা নেয় আরেক জেনারেল এরশাদ। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর সামরিক শাসনবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্য তথা ১৫ দলীয় ঐক্যজোট গঠন, জাতীয় দাবি ৫ দফা প্রণয়ন ও যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি বলিষ্ঠ ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৩ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের সামরিক সরকার আবার তাকে গ্রেফতার করে এবং ক্যান্টনমেন্ট জেলে অন্ধকার কক্ষে ১৪ দিন আটক রাখে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের আগে স্বৈরাচারকে পরাস্ত করার কৌশল হিসেবে তিনিই দিয়েছিলেন দুই নেত্রীর ১৫০-১৫০ আসনে নির্বাচন করার ফর্মূলা। ভীত হয়ে এরশাদ অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন যে কোন প্রার্থী ৫টির বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দিতা করতে পারবেন না। এ ঘটনায় ‘এরশাদের যম’ বলে তাকে অভিহিত করেছিল অনেকে। তিনবার সিপিবির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া এই নেতা আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন ২০০০ সালের মধ্যে বিপ্লব সংগঠিত করার। ১৫ দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৮৬ সালে তিনি পঞ্চগড়-২ আসন তথা বোদা-দেবীগঞ্জ নির্বাচনি এলাকা থেকে নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদের সদস‍্য। তিনি ছিলেন অনলবর্ষী তুখোড় বক্তা। জাতীয় সংসদের ইতিহাসে তার দেয়া ভাষণ আজও ইতিহাস হয়ে রয়েছে।

১৯৮৭ সালের ৯ অক্টোবর মস্কোতে বাংলাদেশ সময় রাত ৮টায় আকস্মিকভাবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের কর্মবহুল জীবনের অবসান ঘটে। এই ব্যক্তিটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কতটা মহীরুহে পরিণত হয়েছিলেন তা অনেকের কাছেই অজানা। বিশেষত বর্তমান প্রজন্মের কাছে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ এক অচেনা নাম। বই-পুস্তক, পত্রিকা, টেলিভিশন,  রাজনৈতিক আলোচনা, কোথাও আর উচ্চারিত হয় না এই নামটি। কমরেড ফরহাদ যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন-বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি- সেই দলটিও বর্তমানে তেমন সুসংগঠিত নয়। জাতীয় পর্যায়ে দলটির আর আগের মত প্রভাব নেই। অথচ এই আশির দশকে দলটির কাণ্ডারি যখন ছিলেন কমরেড ফরহাদ, তখন অন্যরকম পরিস্থিতি ছিল। বলা চলে কমরেড ফরহাদের জীবদ্দশায় এটি ছিল দেশের অত্যন্ত সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল একটি দল। এই দলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশে অজস্র প্রগতিশীল ধারার ছাত্র আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, ক্ষেতমজুর আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন সর্বোপরি জাতীয় আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই দলটি ছিল বাংলাদেশর মুক্তিকামী মানুষের সাহসী ঠিকানা। আর এর সিংহভাগ কৃতিত্ব কমরেড ফরহাদের। উল্লেখ্য, কমরেড ফরহাদের মৃত্যুর পর নেতৃত্বের সংকট আর সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের বিপর্যয়ে দলটি আগের সেই অবস্থান আর ধরে রাখতে পারেনি।

নিউজনেক্সটবিডিডটকম/এসকেএস


সর্বশেষ

আরও খবর

দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির

দুইদিনের বিক্ষোভের ডাক বিএনপির


ভোট সুষ্ঠু হয়েছে; দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের

ভোট সুষ্ঠু হয়েছে; দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের


জাতীয় পার্টির ‘ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন’ বিরোধী সমাবেশ

জাতীয় পার্টির ‘ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন’ বিরোধী সমাবেশ


গালিগালাজের ভয়েস নিজের না দাবি নিক্সন চৌধুরীর

গালিগালাজের ভয়েস নিজের না দাবি নিক্সন চৌধুরীর


বিএনপি মহাসচিবের বাসায় ঢিল: ১২ নেতা সাময়িক বহিষ্কার

বিএনপি মহাসচিবের বাসায় ঢিল: ১২ নেতা সাময়িক বহিষ্কার


‘সুপারম্যান‘ ট্রাম্প করোনাভাইরাসের ‘সুপারপাওয়ার‘ বুঝতে ভুল করেছেন

‘সুপারম্যান‘ ট্রাম্প করোনাভাইরাসের ‘সুপারপাওয়ার‘ বুঝতে ভুল করেছেন


লন্ডনে টাওয়ার হ্যামলেটস এর স্পীকার হিসেবে দায়িত্ব নিলেন ব্রিটিশ বাঙ্গালী আহবাব হোসেন

লন্ডনে টাওয়ার হ্যামলেটস এর স্পীকার হিসেবে দায়িত্ব নিলেন ব্রিটিশ বাঙ্গালী আহবাব হোসেন


ভেঙে গেলো গণফোরাম

ভেঙে গেলো গণফোরাম


২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু


ভূরাজনৈতিক বিরোধে জাতিসংঘকে দুর্বল না করার আহবান প্রধানমন্ত্রীর

ভূরাজনৈতিক বিরোধে জাতিসংঘকে দুর্বল না করার আহবান প্রধানমন্ত্রীর