Thursday, January 31st, 2019
পুলিশ সেবা সপ্তাহ ২০১৯: তুমি কী আমার বন্ধু!
January 31st, 2019 at 5:46 pm
পুলিশ সেবা সপ্তাহ ২০১৯:  তুমি কী আমার বন্ধু!

কনক হায়দার:

২৭ শে জানুয়ারী থেকে শুরু হল “পুলিশ সেবা সপ্তাহ ২০১৯”। এর ব্যপ্তি থাকবে ২রা ফেব্রুয়ারী অব্দি। “পুলিশকে সহায়তা করুন, পুলিশের সেবা গ্রহণ করুন”, এই স্লোগানকে সামনে রেখে ঢাকাসহ সারা দেশে পালিত হচ্ছে এই সেবা সপ্তাহ। আয়োজনের দ্বিতীয় দিনে, সারাদেশ জুড়ে ছিল র্যা লি। উদ্দেশ্য, পুলিশের সেবা সম্পর্কে সাধারণ নাগরিককে, জনগণকে অবহিত করা, সচেতন করা।

একটা সময় ছিল, যখন কোন একটা গ্রামে একজন মানুষ খুনের ঘটনা ঘটলে সেই গ্রামসহ আশেপাশের পুরো এলাকা পুরুষ শূন্য হয়ে পড়ত। তরুন-যুবক তথা সমর্থ ব্যক্তিরা পালিয়ে বাঁচতে সচেষ্ট হতেন, অযাচিত আর অনাকাংখিত ঝামেলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে। স্বাধীনতা পূর্ব যুগে, বিশেষ করে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী যুগ থেকে, পুলিশি কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আমাদের গ্রাম বাংলার চিত্রটা ছিল এমনই। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও সেই চিত্র খুব একটা পাল্টায়নি, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। শহর এলাকার চিত্রটা এতটা হতাশাব্যঞ্জক না হলেও খুব একটা আশাপ্রদ নয়। এর একটা কারণ হতে পারে, শহুরে বা পৌর এলাকায় শিক্ষিত নাগরিকের আধিক্য, নাগরিকের এই অংশটি আইন বিষয়ে অধিকতর সচেতন। যে কারণে শিক্ষিত নাগরিকের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ ক্ষেত্র বিশেষে অযাচিত হয়রানীর হাত থেকে রেহাই পেয়ে যান। তারপরেও, নাগরিক সমাজের বৃহৎ অংশের কাছে আজও পুলিশ অর্থই হ’ল “আতঙ্ক আর অনর্থ”। এক্ষেত্রে, বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের অনেকেই মন্তব্য করে থাকেন, উপনিবেশবাদী যুগে ভারতীয় উপমহাদেশের সাধারণ নাগরিককে দমনের লক্ষ্যে যে পুলিশ বাহিনী আর এ সংক্রান্তে সংশ্লিষ্ট যে আইনসমূহ সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা স্বাধীনতা অর্জনের পরেও একই থেকে গেছে। একটা স্বাধীণ দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে যে পুলিশ বাহিনী সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল, সেটা কখনই হয়ে ওঠেনি।

পুলিশের প্রতি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা এই ধারণাকে পাল্টে দিতে, বিগত সময়ে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের অনেকেই চেয়েছেন পরিবর্তন আনতে। বিগত অনেকগুলো দশক ধরেই, আমরা শুনে এসেছি, নাগরিকের সেবা নিশ্চিতকরণে পুলিশ প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো হবে। জনগনের বন্ধু হিসেবে পুলিশ প্রশাসনকে গড়ে তোলা হবে একটি দক্ষ ‘সিভিল ফোর্স’ হিসেবে। কিন্তু সেটা না হয়ে, পুলিশ বাহিনীকে প্রতিপক্ষ বা বিরোধীপক্ষকে দমনের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বারংবার। ব্যক্তি ক্ষেত্রে অনেকেই, প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতেও উদ্যোগী হয়েছেন এই বাহিনীকে ব্যবহার করবার মধ্য দিয়ে। নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে একটি দক্ষ, বন্ধুসুলভ, ‘মানব সেবা’ এবং ‘মানবিক সেবা’কে অগ্রাধিকার দেয়া বাহিনী হিসেবে পুলিশ বাহিনীকে তৈরী করতে ব্যর্থ হ’য়েছে প্রায় প্রত্যেকটি সরকার। ফলশ্রুতিতে, খোদ পুলিশ বাহিনীর ভেতরেই একটা অংশের বিরুদ্ধে নাগরিক নিষ্পেষণ, পোশাকি ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ অপরাধের নানা শাখায় বিস্তৃতি ঘটবার মত অভিযোগ ওঠে প্রায়শঃই। এমনও জনশ্রুতি আছে যে, বিত্তশালী অপরাধীরা তাদের শত্রু পক্ষকে হত্যা করতে আজকাল আর ভাড়াটে খুনীর খোঁজ করে না।

“সঙ্গদোষে লোহা ভাসে”, বাংলা ভাষায় এই বাক্যের ব্যবহার প্রায়শঃই হ’য়ে থাকে। মনে প্রশ্ন জেগে ওঠা খুবই স্বাভাবিক যে, চোর, ডাকাত, অপহরণকারী, ছিনতাইকারী, ঠগ, ঘুষখোর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, ভাড়াটে খুনীসহ ইত্যাদি অপরাধীদের সাথে, দায়িত্বের খাতিরে সংস্পর্শজনিত কারণেই কি পুলিশ সদস্যদের এই নৈতিক অবক্ষয় বা অধঃপতন? আমাদের সাধারণের জন্য সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে গিয়ে নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি দেখা দিয়েছে?? নাকি নিয়োগ প্রক্রিয়া দুর্নীতির দোষে দুষ্ট হবার কারণে নিয়োগপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের কর্মক্ষেত্রে অপরাধী হিসেবে নিজের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করেন???

আলোচিত ডিআইজি মিজান

পুলিশ বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তার দুর্নীতি বা অনিয়ম দেখে সাধারণ নাগরিকের একটা অংশ প্রায়শঃই মন্তব্য করেন, ‘নিয়োগ বানিজ্যে’র আবহে নিয়োগ প্রাপ্ত পুলিশের কাছ থেকে আমরা সাধারণ নাগরিক কখনই আমাদের জন্য নির্ধারিত সেবা পাব না।’  ২০১৫ সালে পুলিশ বিভাগে প্রায় ১,০০০ এসআই নিয়োগের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর সাথে শুরু হয় তদবির বানিজ্য। শুরু হয় ক্ষমতাসীন এমপি, মন্ত্রীদের তদ্বির সংক্রান্তে টেলিফোন। সূত্রমতে, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তৎকালীন মহাপরিদর্শক শহীদুল হককে জানান যে, একেকজন প্রার্থীর কাছে থেকে চাকুরীর নিশ্চয়তা দিয়ে ১০ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা নেয়া হচ্ছে (সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৩১শে জুলাই, ২০১৫)। শহীদুল হক লিখিত বিবৃতির আকারে সংবাদ মাধ্যমকে বিষয়টি অবহিত করেন। বিবৃতিতে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, “জননিরাপত্তা বিধানে সৎ, মেধাবী, কর্তব্যপরায়ণ এবং দিনরাত মানুষের সেবা প্রদানের মতো পরিশ্রমী অফিসার একান্ত প্রয়োজন। তাই নিয়োগ প্রক্রিয়া হবে সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক। এ ধরনের অনৈতিক লেনদেন ফৌজদারি অপরাধ।” তিনি আরও বলেন, ‘এসআই নিয়োগে তদ্বির করা হলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।’’

সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত ঘটনাবলী পর্যালোচনা করলে, আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্য বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘেঁটে যাওয়া কতগুলো নাম দৃশ্যমান হয়ে ওঠে যা এই বাহিনী সম্পর্কে তেমনই একটা ধারণা তৈরি করে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা জনগোষ্ঠীর কেউ যদি নৈতিকতার ধার ধারেন না, যদি তার অপরাধী সুলভ চেহারা স্পষ্ট হয়ে পড়ে (Where ‘Criminality’ Becomes More Prominent In Character), তখন তার পক্ষে সমাজ ও রাষ্ট্রের আইন পরিস্থিতির দায়িত্ব দেয়াটাও দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক। ডিআইজি মিজানুর রহমানের অবৈধ সম্পদ অর্জনের গল্প কিংবা তার নারী নির্যাতনের গল্প আর সেসব অনৈতিক ঘটনার সংঘটনে রাষ্ট্রের সম্পদ এবং লোকবল ব্যবহারের উদাহরণ জনমানসে বিভীষিকা তৈরি করে বৈকি। মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাসুদ শিকদারের ছিনতাইকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া আর তার শিকার বা ভিকটীম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য বের হওয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে বাঁধে নিয়ে নাঙা করে “ক্রসফায়ারে” হত্যা করবার হুমকি দেয়া, এসবই পুলিশের অপরাধী চেহারাকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। উল্লেখ্য, ঘটনার পরবর্তীতে সময় সংবাদের মাহমুদ রাকিবের প্রতিবেদন তৈরির সময়ে সাক্ষাতকার দেয়ার সময়ে, মোহাম্মদপুর থানার তৎকালীন ‘ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ জামাল উদ্দিন মীরও তার ছিনতাইয়ে অভ্যস্ত এসআই মাসুদ শিকদারের পক্ষ নিয়ে কথা বলছিলেন।

গোলাম রাব্বীর ওপর পুলিশি নির্যাতনের ঘটনার এক সপ্তাহের মাথাতেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কর্মী বিকাশ চন্দ্র দাসের মোটর সাইকেল আটকিয়ে দেন একজন পুলিশের এএসআই। বিকাশ চন্দ্র তাঁর পরিচয় দেন। নির্যাতনে আহত বিকাশ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শোনান পুলিশের সেই কর্মীর কোকিল কণ্ঠে আবৃতি করা এক অদ্ভুত ছড়া –

                                                “আকাশের যত তারা,

  পুলিশের তত ধারা।।”

টেকনাফের ব্যবসায়ী আব্দুল গফুরকে অপহরণ করে ১৭ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা ৭ জন ডিবি পুলিশ সদস্যের দলকে একটি প্রশিক্ষিত ছিনতাই চক্র ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় না, যারা এই অপরাধী কার্যক্রমে সরকারের বা জনগণের করের টাকায় কেনা গাড়ী ব্যবহার করে, তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব অবহেলায় সকল সীমারেখা অতিক্রম করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভীত সন্ত্রস্ত নাগরিক একটা ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে সাধারণের নজরে এনেছিলেন। ঘটনাটা ছিল এমন, একজন পাঠাও অ্যাপস ব্যবস্থাপনার বাইক চালক তাঁর রাইডার নিয়ে ট্রিপ দিচ্ছেন। চালককে পুলিশের একটা দল একটা চেকপোস্টে সিগন্যাল দেয় বাইক থামাতে। চালক তাঁর বাইকটি দাঁড় করান। যথারীতি, পেছনে বসে থাকা আরোহীর ব্যাগের তল্লাশি নেয়া হয়। কিছু না পেয়ে, বাইকটিকে ছেড়েও দেয়া হয়। বাইকটি কিছুদুর যাওয়ার পরে, চালক তাঁর বাইকটি থামিয়ে আরোহীকে তাঁর ব্যাগটি পরীক্ষা করতে বলেন। আরোহী তাঁর ব্যাগ খুলে দেখেন, সেখানে কাগজে মোড়ানো কিছু একটা রয়েছে। চালক সেটা দেখেই রাস্তার পাশে দূরে ছুড়ে ফেলে দিতে বলেন। “গাঁজা ভর্তি” কাগজে মোড়ানো প্যাকেটটি ছুড়ে দিয়ে আবার শুরু হয় চলা। কিছুদুর এগিয়েই আবারও একটা চেকপোস্ট। মাদক বিরোধী অভিযান তখন তুঙ্গে, শুরু হয়েছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেন্সিডিলসহ ইত্যাদি (সিনথেটিক মাদক) নির্মূলে পুলিশী অভিযান, সশব্দ ঘোষণা দিয়ে। পরবর্তী চেকপোস্টে পুলিশের একাধিক কর্মী তন্ন তন্ন করে কিছু একটা খোঁজে। সাধারণ নাগরিকের দায়িত্বে থাকা আর আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য কিছু না পেয়ে দু’জনকেই অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি শুরু করে দেয়। সেই যাত্রায়, চালকের বুদ্ধির জোরে সন্ত্রস্ত সেই রাইডার কোনমতে সম্ভাব্য নারকীয় ঘটনা থেকে মুক্তি পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন।

এর কিছুদিন আগের আরও একটা ঘটনা। ঘড়ির কাঁটায় রাত দু’টো। ঢাকার ডেমরা এলাকার একজন তরুণীর সিএনজি করে বাসায় ফিরবার সময়ে, দু’জন পুলিশ সদস্যের চেকআপের নামে চরিত্র হননের চেষ্টা সাধারণ জনগণের ভেতর প্রচণ্ড ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।

নিগৃহীত নারী

২০০২ সালে ঢাকা ক্লাবের সামনে থেকে রাত ১.৩০ মিনিটে আমার মোবাইল ফোন ছিনতাই হয়ে যায়। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনসটিউটের মোড়টিতেই ছিল পুলিশের একটি টহল দল। সাথে সাথেই জানান হ’ল পুলিশের সেই দাঁড়িয়ে থাকা টহল দলটিকে। আমাকে উপদেশ দেয়া হল থানায় গিয়ে ডায়েরী করতে। একই রিক্সায় করে চলে যাই রমনা থানায় ডায়েরী করতে। পুলিশ কিছুতেই ঘটনাটা ছিনতাই হিসেবে নথিবদ্ধ করতে রাজি নয়। সেটা হয়ে গেল, “হারানো গেছে”। গত বছর খিলগাঁও এলাকার আমার পরিচিত একজনের বাসার নিচতলা থেকে একটা পানির মিটার চুরি যায়। যথারীতি স্থানীয় থানায় ভুক্তভোগী চলে যান একটা সাধারণ ডায়েরী নিবন্ধন করবার জন্য। সবকিছুই হ’ল, কিন্তু দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য “চুরি”-র ওপরে কলম চালিয়ে দিলেন, ওপরে লিখে দিলেন “হারানো গ্যাছে”। স্পষ্ট হ’ল, প্রতি মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে কিংবা পুলিশ সদর দপ্তরে অপরাধের সংখ্যা উল্লেখ করে প্রতিবেদন পাঠাতে হয়। সেখানেও মিথ্যাচার। এর অর্থ দাঁড়ায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ‘অপরাধমূলক ঘটনা কমে গ্যাছে’ জাতীয় বক্তব্য ভেজালযুক্ত।

অতি সম্প্রতি আমার দেখা, খিলগাঁও সিপাহীবাগ এলাকার একটি গ্যারেজের দুটি সিএনজি বাহন (ঢাকা মেট্রো নম্বরের) ছিনতাই হয়। প্রথমটি কোনমতে রক্ষা পায়, কিন্তু আরেকটি ছিনতাই চক্রের হাত থেকে উদ্ধার করা যায়নি। স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই পেশাদার সেই ছিনতাই চক্র সিএনজি চালকের মবাইল ফোন নিয়ে যায়। পরের দিন গ্যারেজের ম্যানেজারের মোবাইলে ফোন আসে। দাবী করা হয় ১ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা। দু’দিন পরে, শেষ অব্দি ৮০ হাজার টাকায় রফা হয়। সিএনজি আবার তার মালিকের জিম্মায় ফিরে আসে। আমি প্রশ্ন করি সিএনজি মালিক সাহেবকে, কেন তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাহায্য নিচ্ছেন না, র্যা বের কাছে তো মোবাইল ফোনের অবস্থান খুঁজে পাবার মত নতুন আমদানীকৃত সর্বাধুনিক প্রযুক্তি আছে। তাঁর উত্তরটা ছিল এমন-

“আর ভাই কইয়েন না। এখন পুলিশের কাছে যামু, পরে পুলিশরে টাকা না দিলে কোন নড়াচড়া হইবো না। পরে, যদিও উদ্ধার হয়, থানার থিকা ছাড়াইতে গ্যালে আবার টাকা পয়সার লেনদেন। এত্ত ঝক্কির দরকার নাই ভাই। ওরা যা চাইতাছে, ওই ভাবেই গাড়ী ছাড়াইয়া আনি।’’

কথার সারবস্তু যা দাঁড়ায় তাতে করে এক ছিনতাইকারীর হাত থেকে বাঁচতে আরেকদল ছিনতাই চক্রের হাতে পরতে আগ্রহী নয় সেই ভুক্তভোগী; আরও দুঃখজনক বাস্তবতাটা ছিল এই যে, মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং এবং কথোপকথন রেকর্ডিং এর জন্য আমদানীকৃত নতুন প্রযুক্তিটি ব্যবহারের উদাহরণ তৈরি হয়েছিল, নারী লোলুপ এবং অনৈতিকতায় গা ভাসানো পুলিশের ডিআইজি মিজানের নির্দেশে, সংক্ষুব্ধ (Victim) মরিয়ম আখতার ইকো-কে ফাঁদে ফেলতে।            

বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসবার পরে, ২০১২ সালে নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে মানের উন্নয়নের লক্ষ্যে “জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল ২০১২” প্রণয়ন করেন। এর মূল লক্ষ্য হ’ল, শুদ্ধাচার চর্চা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে রাষ্ট্রে ও সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। এই ধারাবাহিকতায় মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের নেতৃত্বে সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ২০১৫ সালের ১লা জানুয়ারী থেকে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল কর্ম-পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন অগ্রগতি পরিবীক্ষণ (Monitoring) কাঠামো প্রণয়ন করে। উপরন্তু, দুর্নীতি দূর করে নাগরিকের প্রাপ্য এবং নির্ধারিত সেবার মান বাড়াতে পুলিশসহ সরকারের সকল ক্ষেত্রে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতনক্রম  (Pay Scale) বর্ধিত করেছেন।

সেবা সপ্তাহের প্রথম দিনেই, পুলিশের বর্তমান মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, বিপিএম (বার) ৩৬ তম ক্যাডেটদের (এসআই) প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ পরিদর্শন শেষে তাঁর দেয়া বক্তব্যে সেবার মানসিকতা ও শুদ্ধাচারের অনুশীলন দ্বারা আপন কর্মক্ষেত্রকে সেবার কেন্দ্রস্থলে পরিণত করবার আহবান জানান।

শুদ্ধাচারের ২০টি সূচকের মধ্যে প্রথমেই বলা হয়েছে, ‘পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা’, দ্বিতীয়তঃ ‘সততার নিদর্শন’, তৃতীয়তঃ ‘নির্ভরযোগ্যতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা’, চতুর্থতঃ ‘শৃঙ্খলাবোধ’ এবং ৬ নং সূচকের কলামে উল্লেখ্য অংশে আছে, ‘সেবা গ্রহীতার সাথে আচরণ’ প্রসঙ্গে। ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবায়নের পথে দেশের নাগরিক সমাজের কাছে উন্মুক্ত হ’য়েছে ইন্টারনেট সেবা যার মাধ্যমে একজন সেবা প্রার্থী, ভুক্তভোগী কিংবা অভিযোগকারী অনলাইনেই পাঠিয়ে দিতে পারেন তাঁর অভিযোগ। এ প্রসঙ্গে, সূচকের ৯নং এবং ১৪ নং কলামে স্পষ্ট উল্লেখ আছে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং সামাজিক মাধ্যমে বিচরনের সক্ষমতা বিষয়ে। উপরের সূচকগুলিতে উল্লেখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলেই নিশ্চিত হতে পারে পুলিশের “বন্ধুসূলভ অবস্থান”। সাধারণ নাগরিকের মনে তৈরী হবে সেই নির্ভরতার জায়গা, যেখানে একজন সংক্ষুব্ধ নাগরিক যে কোন বিপদে সহযোগিতার জন্য ছুটে যাবে সেই বন্ধুর কাছে, সাহায্যের আশায়।

পরিশেষে, “পুলিশ সেবা সপ্তাহ ২০১৯” এর উদ্দেশ্য বিষয়ে একটা কথা থেকে যায়। পুলিশের সেবা বিষয়ে জনমানুষকে সচেতন করবার থেকে আরও বেশী করে প্রয়োজন, সাধারণ নাগরিকের মানসপট থেকে পুলিশ সম্পর্কে ভীতি দূর করা। এই সময়ে, অবারিত তথ্য প্রবাহের সময়টিতে, আমরা সাধারণ নাগরিক সমাজ ভাল করেই জানি এবং বুঝি একটি কল্যাণকর সমাজে পুলিশের ভুমিকা কেমন হওয়া প্রয়োজন। সমসাময়িক বাংলাদেশের এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিজ্ঞজন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের বোধের সীমায় আসা প্রয়োজন, উপনিবেশবাদী যুগের পরাধীন জনমানুষকে ‘নিষ্পেষণের লক্ষ্যে সৃষ্ট পুলিশ’ আর উপনিবেশবাদী প্রভুদের দেশীয় আইনের রক্ষায় পুলিশের মধ্যে পার্থক্য কোথায়।

কনক হায়দার:

সর্বশেষ

আরও খবর

বট-খেজুরের সখ্য এবং ‘রক্ত-রস’ রহস্য

বট-খেজুরের সখ্য এবং ‘রক্ত-রস’ রহস্য


চরিত্রবান

চরিত্রবান


ভীতির মিথ: ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি

ভীতির মিথ: ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি


ঢাকা; মৃত জোনাকির থমথমে চোখ

ঢাকা; মৃত জোনাকির থমথমে চোখ


পেটমোটা ঠগীর কবলে নবীন কিশোরেরা

পেটমোটা ঠগীর কবলে নবীন কিশোরেরা


‘আপনি হয় আওয়ামী লীগ অথবা জামাত-শিবির-রাজাকার’

‘আপনি হয় আওয়ামী লীগ অথবা জামাত-শিবির-রাজাকার’


মানুষের স্বাধীনতাহরণই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা

মানুষের স্বাধীনতাহরণই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা


দক্ষিণ এশিয়ার ভাটিয়ালি গণতন্ত্রেরা

দক্ষিণ এশিয়ার ভাটিয়ালি গণতন্ত্রেরা


বদি থেকে মাশরাফি; একই স্বপ্নের দৈর্ঘ্য

বদি থেকে মাশরাফি; একই স্বপ্নের দৈর্ঘ্য


পেডোফিলিক রাজনীতিকদের নিয়ে আমরা কী করবো!

পেডোফিলিক রাজনীতিকদের নিয়ে আমরা কী করবো!